1. admin@banglabahon.com : Md. Sohel Reza :
"আষাঢ়ে গল্প-আষাঢ়ের গল্প" বাঁচিয়ে রাখতে চাই বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার | বাংলা বাহন
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন
আপনিও লিখুন:
‘বাংলা বাহন’ নিউজপোর্টালে আপনাদের মতামত, পরামর্শ, সমসাময়িক কোন বিষয়ে লেখা, বিশ্লেষণ, তথ্য, ছবি ও ভিডিও পাঠাতে পারেন info@banglabahon.com ঠিকানায়।

“আষাঢ়ে গল্প-আষাঢ়ের গল্প” বাঁচিয়ে রাখতে চাই বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার

প্রণব পাল
  • প্রকাশ: রবিবার, ২০ জুন, ২০২১
Writter Pranab Paul
ছবি: লেখক প্রণব পাল

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, দুই বন্ধু চুটিয়ে গল্প করছে, প্রথম বন্ধু বলছে একবার আরব দেশের এক সৈনিক পথভুলে আমাদের গ্রামে চলে আসে। আমার দাদার দাদা তাকে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আগন্তুককে থাকতে দেয়া হয়েছিল, আমাদের বড় একটি ঘরে। আগন্তুক কৌতুহলবশত ঘরের দৈর্ঘ্য মাপার জন্য, ঘরের শুরু থেকে ঘোড়ায় চড়ে ঘোড়াকে দৌড়াতে থাকেন। দাদার কাছে শুনেছিলাম আগন্তুক টানা ছয় মাস দৌড়ানোর পড়েও ঘরের শেষ পর্যন্ত পৌছাতে পারেননি, আমাদের ঘরটা এতই বড় ছিল। এটা ছিল আমাদের বাড়ির সব থেকে ছোট ঘর।
দ্বিতীয় বন্ধু বলল, তোর গল্প শুনে আমার দাদার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। আমার দাদার দাদার একটা তাল গাছ ছিল। সেই তাল গাছ এতটাই লম্বা ছিল যে, তার ছায়া পড়ত চাঁদের বুড়ির গায়ে। বুড়ি একদিন রেগে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে তাল গাছটি ফেলে দিয়েছিল। আমার দাদার দাদা সেই আস্ত তাল গাছ দিয়ে প্রতিদিন দাঁত পরিস্কার করত।

প্রথম বন্ধু অবাক হয়ে বলল, এটা আবার কিভাবে সম্ভব? তোর দাদার দাদা তাহলে এত বড় তাল গাছটা রাখত কোথায়?

দ্বিতীয় বন্ধু উত্তরে বলল, কেন তোর দাদার-দাদার সেই ছোট ঘরে।
এরকম অনেক আষাঢ়ে গল্প আমরা আমাদের অগ্রজদের কাছ থেকে শুনে শুনে বড় হয়েছি। এই আষাঢ়ে গল্প মূলত জমে উঠত আষাঢ়ের বৃষ্টি মুখর দিনে। খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে আমন ধানের হাতে-ভাজা মুড়ি চানাচুর দিয়ে মেখে মুঠোয় মুঠোয় খেতে খেতে চলত এই আষাঢ়ে গল্পের আসর। এখন সেই আষাঢ়ে গল্পের আসর আর বসে না। আমাদের কর্ম ব্যস্ততা সেসব দিনের কথা প্রায় ভুলিয়ে দিয়েছে, আর বর্তমান প্রজন্মের অনেকটা বেশি সময় কাটছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।


আষাঢ়ে গল্প শব্দটির উৎস আসলে আষাঢ়ের গল্প থেকে নয়। আষাঢ়ে গল্প অর্থ অবিশ্বাস্য গল্প। প্রমথ চৌধুরী তাঁর বিচিত্র প্রবন্ধের বর্ষার দিন গল্পে “আষাঢ়ে গল্প” শব্দের উৎসের অবতারণা করেছেন। তিনি বলেছেন যে বাঙ্গালীরা “আষাঢ়ে গল্প” বলে না, তারা বলে “আজাড়ে গল্প”। “আজাড়ে” শব্দটি আষাঢ়ের অপভ্রংশ হতে পারে। আজাড় কোন সংস্কৃত শব্দ নয়। তাঁর ধারণা মতে এটি হয় ফারসি নয় আরবি শব্দ। আষাঢ়ে গল্পের অর্থ অমূলক গল্প। তিনি লিখেছেন, মূলত বাঙ্গালিরা “আজাড়” কথাটি শুদ্ধ করে এটাকে “আষাঢ়” বানিয়েছে।
প্রমথ চৌধুরীর লেখা থেকে আমরা বলতেই পারি, “আষাঢ়ে গল্প” মূলত “আজাড়ে গল্প” থেকে আসা। বর্ষা ঋতুর প্রথম মাস আষাঢ়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পরে আষাঢ়ের এক পশলা বৃষ্টি আমাদের মাঝে শান্তির বারতা নিয়ে আসে। আষাঢ়ের বৃষ্টি কবি মনকে আনমনা করে তোলে।


ফসলের ক্ষেতে যখন আষাঢ়ের প্রথম জল আসত, তখন পাড়ার সব সমবয়সীরা মিলে নতুন জলে গোসল করার জন্য নেমে পড়তাম। আষাঢ়ের নতুন জলের ঘ্রাণ আর মুষলধারে বৃষ্টি, দুইয়ে মিলে মনে হত, বিধাতার আনন্দধারা বর্ষিত হচ্ছে আমাদের ওপর। বন্ধুরা মিলে জলে ডুব খেলার প্রতিযোগিতা করতাম। যে সব থেকে বেশি সময় জলের নিচে ডুবে থাকতে পারবে, সে হবে প্রথম। বৃষ্টির সময় জলে ডুব দেয়ার অনুভূতি ছিল অন্যরকম। জলে ডুব দেয়ার পড়ে মনে হত যেন বর্ষারাণী অবিরাম গুণগুনিয়ে গান গেয়ে চলেছেন। আষাঢ়ের মুষলধারে বৃষ্টি আজও শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাকে।


নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে।/ ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে, কবিগুরুর এই আহ্বান শোনার মতো ন্যুনতম সময় আমাদের হাতে ছিল না। তাঁর এই আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে, আষাঢ়ে বৃষ্টি এলেই নেমে যেতাম জলে। আহা! সে কি দুরন্ত শৈশব ছিল আমাদের। যতক্ষণ পর্যন্ত না চোখ লাল হয়ে সূর্যের মত হত, ততক্ষণ চলত জলের ভেতর এই দুরন্তপনা। কবিগুরুর এই আহ্বান আজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছি। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও এখন আর বৃষ্টিতে ভেজা হয় না, নতুন জলের ঘ্রাণ নেয়াও হয় না। অতিরিক্ত কর্ম ব্যস্ততার কারণ গ্রামে খুব বেশি যাওয়ার সুযোগ হয় না। গ্রামগুলোতেও আগের মত খোলা মাঠ খুব বেশি চোখে পড়ে না। যান্ত্রিক এই শহরে সন্তানকেও শেখাতে/দেখাতে পারছি না প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য্য। আমাদের নিষ্ঠুর কষাঘাতে প্রকৃতি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলছে। মনুষ্য সৃষ্ট দূষণে প্রকৃতি আজ বিপর্যস্ত। আমাদের পুঁজিবাদী মানসিকতা, পরিবেশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও পরিবেশের প্রতি মমত্ববোধ না থাকাই এর মূল কারণ।


দৈনিক বনিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক পণ্যের বাজার রয়েছে। যা ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ বিলিয়ন ডলারে দাড়াবে। প্লাস্টিকের বৈশ্বিক ব্যবহার মাথাপিছু ৫০ কেজি, বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ৫-৭ কেজি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে। প্লাস্টিক ছাড়া আমরা প্রায় কোন কিছুই ভাবতে পারি না। প্লাস্টিকের সহজলভ্য ও দীর্ঘস্থায়ীত্বের কারণে এটির গ্রহণযোগ্যতা মানুষের কাছে দিন দিন বেড়েই চলেছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ অযোগ্য প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশের জন্য রীতিমত হুমকিস্বরুপ। এই প্লাস্টিকগুলো যেখানে-সেখানে ফেলে দেয়ার কারণে শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। গ্রামে কৃষি জমির উর্বরতাও নষ্ট হচ্ছে।


একটি আষাঢ়ে গল্প বলছি-
২০৭০ সাল
পৃথিবীতে এখন আর আষাঢ় – শ্রাবণ কিছু বোঝার উপায় নেই। কারণ এখন আর আষাঢ় মাস কেন, কোন মাসেই বৃষ্টি হয় না। চারিদিকে কোন গাছপালা আর অবশিষ্ট নেই। চারিদিকে বড় বড় অট্টালিকার শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে মানুষ বসবাস করে। রাস্তায় বের হওয়া যাচ্ছে না রৌদ্র তাপে। সবাইকে এখন শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চলাচল করতে হয়। মা-বাবারা শিশুদের নিয়ে আর খোলা মাঠে, নদীর তীরে, পার্কে যায় না। কারণ এসবের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পাখির কলকাকলিতে এখন আর ভোর হয় না। কারণ পৃথিবীতে এখন আর কোন পাখি নেই। ঝিঝি পোকারা এখন আর চৈত্রের তপ্ত দুপুরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দেয় না, বসন্তে আর কোকিল কুহুকুহু ডাকে না। মুষলধারে বৃষ্টি শেষে ব্যাঙের আনন্দ কোলাহল শোনা যায় না। শরতের আকাশ সাদা মেঘের ভেলায় আর ভাসে না। বৃষ্টি এলো কাশবনে/ জাগল সাড়া ঘাস বনে/ বকের সাড়ি কোথারে/ লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে, এ কবিতা শিক্ষকরা ক্লাসে আর পড়ান না। কারণ শিশুরা এখন বৃষ্টি, কাশবন, ঘাসবন, বাঁশবন, বকের সাড়ি এসবের কিছুই বোঝে না। ক‍ৃষকের আজ কোন তাড়া নেই। কারণ এখন কৃষিকাজ মাঠে করতে হয় না। কৃষকের সবুজ ফসলের মাঠ এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে। মানুষ এখন প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত প্রজাতি, তাদের খাবার প্রস্তুত হয় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে। মানুষ মন চাইলেই সকালে মঙ্গলগ্রহে নাস্তা করে বিকালে চাঁদের দেশে বেড়াতে যায়। পৃথিবীতে কোন মাটি নেই, আছে শুধু প্লাস্টিক আর প্লাস্টিক। মানুষের শেষ ঠিকানার জন্য মাটি খুড়তে হয় না, মানুষের কবর হয় প্লাস্টিকের নিচে।

আমাদের পৃথিবীকে এই আষাঢ়ে গল্পের পৃথিবী হতে দেয়া যাবে না। প্লাস্টিকের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ অযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশ বান্ধব প্লাস্টিকের উৎপাদন বাড়াতে হবে, সাধারণের মধ্যে এটির ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। সবাই মিলে সচেতন হলে এই প্লাস্টিক বোমার হাত থেকে আমরা পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারব।

৫ জুন, ২০২১ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল “বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার”, বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি উপাদানকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। মানুষের দূষণে-শোষণে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালির সকল পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, ফলে নদীর জল নষ্ট হয়ে জলজ জীব-বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। নদীর পচা জলের গন্ধে আশে-পাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। জলদূষণ ও বায়ুদূষণে স্থানীয়দের শরীরে নিত্যনতুন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নানামুখি পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিল্প-কারখনার বর্জ্য পরিশোধন না করে নদী বা উন্মুক্ত স্থানে নিঃসরণ করা যাবে না। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে। প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রতিটি খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করতে হবে, পরিবেশ নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের পৃথিবী হবে সবার বাসযোগ্য, সবার অভয়ারণ্য। আষাঢ়ের গল্পে মুখরিত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবী।

লেখক: প্রণব পাল
ব্যাংক কর্মী
ই-মেইল: ই-মেইল:  pranabpaul30ju@gmail.com

বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি উপাদানকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। মানুষের দূষণে-শোষণে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালির সকল পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, ফলে নদীর জল নষ্ট হয়ে জলজ জীব-বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। নদীর পচা জলের গন্ধে আশে-পাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। জলদূষণ ও বায়ুদূষণে স্থানীয়দের শরীরে নিত্যনতুন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নানামুখি পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিল্প-কারখনার বর্জ্য পরিশোধন না করে নদী বা উন্মুক্ত স্থানে নিঃসরণ করা যাবে না। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে। প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রতিটি খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করতে হবে, পরিবেশ নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

শেয়ার করুন...

2 thoughts on "“আষাঢ়ে গল্প-আষাঢ়ের গল্প” বাঁচিয়ে রাখতে চাই বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার"

  1. ananta says:

    Very effective writing…

  2. Sushanta Kumar Paul says:

    সময়োপযোগী লেখা। প্লাস্টিকের ব্যাবহার কমাতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ...
© বাংলা বাহন সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০১৯-২০২১।
ডিজাইন ও আইটি সাপোর্ট: বাংলা বাহন